January 22, 2018 12:24 pm

অন্তরালের অভিনয় -ভালোবাসার গল্প


দ্রুত গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের খোলা জানালার পাশে বসেও ঘেমে উঠেছে অরণী।তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোটা স্পষ্ট।একটু কান পাতলেই সব কিছু ছাপিয়ে নিজের হৃদপিন্ডের স্পন্দনটাও
পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে সে।তবুও নিজেকে যত টা সম্ভব শান্ত রেখেছে অরণী।তখনও তার চোখ জানালার বাইরে। সে প্রাণপন চেষ্টা করছে তার বিপরীতে বসা মানুষটার দিকে না তাকাতে।কিন্তু কি এক অজানা আকাঙ্খায় বার বার আড় চোখে দৃষ্টি দিচ্ছে মানুষটির দিকে।

ভালোবাসার গল্প

ভালোবাসার গল্প

তার বিপরীতে বসা মানুষটির মুখ দেখা যাচ্ছে না।সামনে ধরে রাখা খবরের কাগজে নিজে প্রায় সমস্তই আড়াল করে ফেলেছে।কিন্তু চোখ দুটি তখনও স্পষ্ট। আর সেই চোখের দিকে চোখ পড়তেই ধড়াশ করে ওঠে অরণীর বুকের ভেতর। একটি মায়া কাড়া চোখ,পরিচিত মুখ, সেই ক্যাম্পাস,,ক্লা
স ফাঁকি দিয়ে হাত ধরে ঘুরে বেড়ানো,আর অজস্র খুনসুটি ভরা দৃশ্য গুলো ফ্লাসব্যাকের মত মনের মাঝে উঁকি দিতে থাকে তার। হঠাত্ মনে উঁকি দেওয়া স্মৃতি গুলো হারিয়ে ফেলার ভয়ে দ্রুত চোখ বন্ধ করে ফেলে অরণী।মনে হয় এভাবেই কাটিয়ে দিতে পারবে সে সারাজীবন

পরিচিত একটা কন্ঠের ডাকে ঘোর ভাঙে অরণীর।চোখ খোলা মাত্রই সামনের মানুষটি স্পষ্ট হয়।এখন আর কোন প্রতিবন্ধকতা তাকে আড়াল করে নেই! বহুদিনে সেই চিরচেনা মুখ আবার কখনও দেখতে পাবে,,সময়ের পরিবর্তনে এটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলো অরণী।অদ্ভূত একটা অনুভূতি আরষ্ট করে ফেলে তাকে,,যার ব্যাখ্যা জানা নেই তার!
কেমন আছো? ”
নিজেই আগে প্রশ্ন করে নিলয়।-হুম,ভালো….তুমি? অনেকটা জোর করেই কথা বলে অরণী।
-এই তো,,চলে যাচ্ছে! বলেই ঠোটের কোনে কিঞ্চিত্ হাসি ফুটিয়ে তোলে নিলয়।
তারপর বেশ কিছুক্ষন দুইজনেই চুপ। নিরবতা ভেঙে নিলয়ই আবার কথা বলে।
-তোমার মেয়ে নাকি? নিলয় তখন অরণীর কোলে ঘুমিয়ে থাকা ২বছরের ছোট্র বাবুটার দিকে তাকিয়ে আছে,,অরণীও স্পর্শর দিকে তাকায়।কিছুক্ষনের জন্য অরণী তার কোলে ঘুমিয়ে থাকা ছোট্র স্পর্শের অস্তিত্ব ভুলেই গিয়েছিলো। অরণীকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার কথা বলে নিলয়,, বিয়েটা করেছো তাহলে? হঠাত্ করে অরণীর মাথায় পুরোনো রাগটা চেপে বসে আবার,
জোর গলায় বলে, হ্যা করেছি!আর অনেক সুখে আছি আমি আমার এই জীবনে।যেখানে আমাকে কষ্ট দেওয়ার মত কেউ নেই!আমাকে ভুল বোঝার মত,অবিশ্বাস করার মত কেউ নেই!
-তাহলে তুমি স্বীকার করছো অরণী,সেদিন আমি ঠিক ছিলাম।আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিলো..শুধু দূর্বলতা মাত্র,তাইতো? নিলয়ের কথা গুলো ছুরির মত অরণীর বুকে এসে বিধেঁ,কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়।প্রবল বেগে ছাপিয়ে ওঠা কান্নাটাকে অতি কষ্টে নিয়ন্ত্রন করে নিজের ভেতর। তারপর ধীর গলায় বলে,
-তুমিও তো অর্পিতাকে নিয়ে ভালো আছো,তাহলে আজ আর এইসব বলে লাভ কি?
-হুম..ভালো আছি।অনেক ভালো…
ট্রেন তখন স্টেশনে এসে পৌছেছে।নিলয় উঠে পড়ে।তার গন্তব্যে চলে এসেছে।স্থির ভাবে কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে কিছু না বলেই ট্রেন থেকে নেমে পড়ে সে। আর তার চলার পথের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অরণী।

৩-কি হয়েছে তোর?এইরকম দেখাচ্ছে কেন তোকে? আফসানার কথায় চমকে ওঠে অরণী।
-নাহ,তেমন কিছু না
-ওই যে কয়েক টা সিট পেছনেই বসা মেয়েটি তনিমা,আমার সেই ছোট্র বেলার বন্ধু।হঠাত্ ওর সাথে দেখা হয়ে গেলো,তাই একটু দেরি করে ফেলেছি। বাবু কি তোকে খুব জ্বালিয়েছে?
আফসানা জিজ্ঞাসা করে অরণীকে!
-নাহ আপু…আমাদের স্পর্শ তো লক্ষী একটা মেয়ে।ও কি কাউকে জ্বালাতে পারে?
অরণী ছোট্র স্পর্শকে আফসানার কোলে দেয়।অরণীর বড় বোন আফসানার মেয়ে স্পর্শ।আরণীর একা জীবনের দিশা এই মেয়েটি।

একটি ছোট্র ভুল বোঝাবোঝির জন্য নিলয়ের সাথে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর আর কখনই কাউকে নিয়ে ভাবতে পারেনি অরণী।তাই এতবছর পরেও আজও সে একা।

একটা দীর্ঘনিশ্বাষ ফেলে আরণী। মনে মনে বলে সেদিনও আমাকে বোঝোনি তুমি নিলয়,আর আজও বুঝলে না। মনের গহীনে থাকা তীব্র যন্ত্রনায় আবার ভিজে ওঠে অরণীর চোখের পাতা…অতি সন্তর্পনে আড়াল করে সে জমে ওঠা দু ফোটা অশ্রুকে


এক মনে হাঁটছে নিলয়।এত বছর পর হঠাত্ অরণী আবার তার সামনে আসবে এটা কল্পনার বাইরে ছিলো নিলয়ের।
সেই একইরকম জেদী আছে মেয়েটি!পরিবর্তন হয়নি মোটেও!
যাক তবুও সুখে তো আছে।তার মত একা তো আর থাকতে হয়নি অরণীকে।
মনে মনে ভাবে নিলয়।
নিলয়ের সাথে অর্পিতার বিয়েটা শেষ মূহুর্তে ভেঙে যায়।নিলয় বুঝেছিলো অরণী ছাড়া আর কাউকে আর জীবনে স্থান দেওয়া সম্ভব না।তাই অর্পিতাকে না বলে দিয়েছিলো।
শেষ খবরটা অনেকেই পাইনি।তাই আজও অরণীর মনে অর্পিতা আর নিলয় সম্পর্কটা বদ্ধমূল।

চাপা কষ্টে নিজের ভেতরে ছটপট করে নিলয়।মনের ভেতর থেকে কেউ একজন বলে আজও ভালোবাসাটা শুধু তোমারই জন্য অরণী।

নিলয় আর অরণীর অন্তরালের অভিনয় টা তাদের নিজেদেরই অগোচরে থেকে যায়।অন্তরীক্ষে থাকা কেউ একজন হয়ত বা প্রত্যক্ষ করেও চুপ করে থাকে!
আর পথের দেবতা প্রতীক্ষায় থাকে আবার কখনও তাদের দেখা হওয়ার অপেক্ষায়।হয়ত বা সেদিন ভুল বোঝাবোঝির অবসান হলেও হতে পারে।

Comments