January 23, 2018 12:02 am

কাশফুলে জীবনের ছবি – Shapon

ক্লান্তিতে সাদা এপ্রোনটাও আজ সাদা মনে হচ্ছে না। কাঁধের ওপর থাকা স্টেথোস্কোপটার সামান্য ওজনেই যেন হাটতে পারছি না। ওয়ার্ডের মাঝামাঝি এসে এপ্রোন-এ একটা টান অনুভব করলাম। তাকালাম পিছন ফিরে। পাশের বেড-এ শুয়ে থাকা রোগী আমার এপ্রোনটা টেনে ধরে আছে।
‘কিছু বলবেন?’ পাশে বসতে বসতে রোগীর হাতখানা নিজের হাতের মাঝে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। উত্তর পেলাম না, শুধু হাতখানা শক্ত করে ধরে রাখার একটা প্রবল চেষ্টাটুকু বুঝতে পারলাম। বয়স ৭০ এর কাছে হবে হয়তো। পাশে কাউকে দেখতে পেলাম না। অসহায়ত্ব ফুঁটে উঠেছে উনার পোশাক, মাথার উসকো চুল, মুখের সাদা দাড়ি আর চোখের কোণের জমাটবাঁধা অশ্রু সবকিছুতেই।
কিছু বলার আগেই হাতটা ছেড়ে দিলো। চোখ দু’টো বন্ধ করতেই অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।
পাশে রাখা ফাইলটা হাতে নিয়ে রোগীর নাম দেখলাম। অনেক ঔষধ লেখা থাকলেও বেড-এ কোন ওষুধ চোখে পড়লো না। ক্লান্তিটা আবার ঘিরে ধরতে শুরু করেছে আমাকে।
উঠতে গিয়ে এবার আরো শক্ত টান অনুভব করলাম।
‘এই নম্বরে একটা ফোন দিবেন?’ হাতে ছোট্ট একখানা কাগজ আমার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন। নম্বরটা ফোনে তুলে ডায়াল করলাম, বন্ধ।
‘নম্বর তো বন্ধ।’

Shafiqul Islam Shapon

Shafiqul Islam Shapon

কিছুটা সময় আর কিছু বলার ভাষা হয়তো উনার ছিল না। ‘আজ প্রায় ৪ বছর পর একটু কথা বলতাম, হলো না। শেষ সময়টাও একাই থাকতে হলো………..’।
আর কিছু বলতে পারলেন না উনি। চোখ বন্ধ তবুও দু’কোণ দিয়ে যে অশ্রু গড়িয়ে পরছে তা বেশ স্পষ্ট। হাতের ভিতর নম্বর লেখা কাগজটা শক্ত করে ধরে রেখেই আমাকে ইশারা করে চলে যেতে বলছে উনি।
সেবিকাকে ডেকে কিছু জানতে চাওয়ার আগেই বললো-‘স্যার, গতকাল এসেছেন উনি। এখন অবধি কেউ আসেনি। এমনকি ওষুধ কিনে দেবারও মানুষ আসেনি।’
‘এই টাকা দিয়ে ওষুধ এনে তুমি নিজেই উনাকে খাইয়ে দিবে প্লিজ।’
সেবিকাকে টাকা দিয়ে চলে এলাম।
৩ তলা থেকে নেমে ড্রাইভারকে ফোন না দিতেই গাড়ি নিয়ে উপস্থিত।
কী কী যেন বলছে বা জিজ্ঞাসা করছে ড্রাইভার তা বুঝতেই পারছি না। বোঝার চেষ্টাও করছি না। আমি গাড়িতে বসার পর এটা ওর অভ্যাস হয়ে গেছে। বহুদিন নিষেধ করাতেও অভ্যাস ছাড়তে পারেনি।
ফোনটা হাতে নিয়ে আবার ডায়াল করলাম। বন্ধ। কী করা উচিত তা আমার জানা নেই। তবুও জানানোর চেষ্টাস্বরূপ একটা ম্যাসেজ করলাম।
বাসায় যখন ফিরলাম তখন রাত প্রায় ২টা। মা, বাবা, ছোট বোন কেউ এই সময় জেগে নেই, থাকার কথাও না। প্রায় ৪ বছর থেকে ডাক্তারী পেশায় আছি। ভালো-মন্দ সব অনুভূতিই রয়েছে এই সময়ের মাঝে। সিনিয়র কেউ মেডিক্যালে না থাকলে সেদিন এমন ডাবল ডিউটি দায়িত্ববোধ থেকেই করতে হয়। ক্লান্তি আসলেও খারাপ লাগে না। প্রথমদিকে মা জেগে থাকতো, এমন আর নয়। অনেক দিন বুঝিয়ে বলাতে উনার এই অভ্যাস বদলেছে।
সকালে মায়ের ঘুম ভাঙানি স্নেহভরা ডাক, মাথায় এক হাতের বিলি কাটুনি আর অন্য হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ছেলের ঘুম ভাঙার অপেক্ষা, বাবার শরীরের অবস্থার নজরদারি, ছোট বোনের ‘ভাবী আসবে কবে’ আবদারের শান্তনা প্রতিজ্ঞা, মায়ের কোলে একটু মাথা রেখে ‘এই তো আর কয়েকটা দিন মা, তাই তোমার আর কষ্ট হবে না, তখন সব কাজ আমার বউ করে দিবে’ বলে অজুহাত ভরাট। কখন যে সময় ঘনিয়ে আসে তা বুঝেই পারি না।
যদিও আজ দেরিতে গেলেও সমস্যা নেই, তবুও রোগীটার অবস্থা দেখার জন্যই গেলাম। ৩তলায় উঠে একটু অবাক হলাম। কালকের সেই বেড আজ ফাঁকা। এক সেবিকাকে বলতেই জানালো-‘ভোরের দিকে উনি মারা গেছে। তার কিছুক্ষণ পর উনার মেয়ে পরিচয় দিয়ে একটি মেয়ে এসে লাশ নিয়ে যায়।’
ফোনটা বের করে দেখলাম ভোর ৪.১০ মিনিটে ম্যাসেজটা ডেলিভারি হইছে ঐ নম্বরে। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে রেজিষ্ট্রারে গিয়ে জানতে চাওয়ায় খাতা বাহির করে দেখালো। লাশ গ্রহণকারীর ঠিকানায় যে নম্বর সেটাতেই ম্যাসেজ করেছিলাম। কয়েকবার ফোন দিলাম, রিসিভ হলো না।
প্রায় ১৩ দিন পর ঐ নম্বর থেকে ম্যাসেজ।
‘কথা বলা যাবে কী?’
উত্তর না দিয়ে ফোন দিলাম।
‘ঐশী, এটা আমার নাম। আপনার?’ রিসিভ করেই এভাবে কথা বলবে সেটা বুঝিনি।
‘নিশাত’।
একটু অপেক্ষা করে-‘বাবার চিকিৎসায় আপনার কিছু টাকা খরচ হইছে, সেটা কীভাবে নিবেন?’
কথায় এসব বিষয় চলে আসতে পারে তা জানতাম না। জানালাম টাকাটা ফেরত না দিলেই খুশি হবো।
আমার খুশি দিয়ে যে তার ঋণবোধ দূর হবে না, সেটাই ভালো করে কয়েকবার বুঝিয়ে দিল।
কখন যে কল কেটে গেছে নাকি কেটে দিছে তা বুঝতে পারিনি। ম্যাসেজ ভাইব্রেট হওয়াতে কান থেকে ফোনটা সরালাম।
‘ধন্যবাদ’। শুধু এটুকুই লিখা ছিল।
এরপর প্রায় প্রতিনিয়তই কথা হতো। প্রথমদিকে হায়-হ্যালো, তারপর খেয়েছেন কিনা, তারপর কাল কি করবেন, তারপর………………… প্রায় ১ মাস অতিবাহিত। গত এক মাসে ফোনে মিনিট থেকে মিনিট বেড়েছে, ম্যাসেজের সংখ্যা একটু একটু করে বেড়েছে, ফেসবুক-এ নিজেদের জানতে-জানাতে শিখেছি। এতকিছুর পরও আমি তাকে বুঝাতে পারিনি-‘টাকা টা ফেরত না দিলেই আমি খুশি হবো’।
আজ প্রায় ৩ মাস পর সিনিয়রকে বলে ২ দিনের অবসর পেয়েছি। ছোট বোনের ভার্সিটির ভর্তির দিনটা অন্তত ওর সাথে থাকতে পারবো।
ইশিকা, ছোট বোন। এস. এস. সি তে ভালো কিছু করতে পারলেও এইচ. এস. সি তে ভালো করে নি। তবুও কেন যেন ভার্সিটি চান্সটা পেয়েছে। ওর জন্ম থেকেই দেখছি ভাগ্য ওকে সহায়তা করে সবসময়।
শীতের মধ্যসময়। না বেশি না কম। ছুটির দিনগুলোতে ফোন বন্ধ করেই রাতের ঘুমটা ঘুমাতে যাই। মাও এমন দিনগুলোকে সকালে ডাকবে না জানি। সকালে ঘুম থেকে উঠতেই প্রায় ১০ টা।
ফোন অন করলাম। বাথরুম থেকেই শুনতে পেলাম ম্যাসেজ টোন পর পর দুইবার। ‘মা, নাস্তা দাও’ খাবার টেবিলে যেতে যেতেই ফোনটা হাতে নিয়ে ম্যাসেজ দেখলাম। ‘শুভ রাত্রি। কিছু কথা বলার সময় হবে?’ রাত ১.২৩ মিনিটের ম্যাসেজ।
‘শুভ সকাল। কিছু কথা বলতাম। সময় হবে কী?’ সকাল ৮.৩৪ মিনিটের এটা। নাস্তা শেষে ফোন করলাম। ‘সময় হলে একটু ফেসবুকে আসেন’ বলেই ফোনটা কেটে দিল।
ঐশীর ফেসবুকের নামটা এখনোও আমার কাছে স্পেশাল কিছু। এমন নামের কারণ জানতে চেয়েছি বারবার, ঘুরে ফিরে একই উত্তর। তাই একই উত্তর শুনতে গিয়ে সীমাবদ্ধ সময়ের কিছু অংশ নষ্ট করে কাজ নেই।
‘বর্ণিল কাশফুল’। আমি কখনো শুনিনি বা দেখিনি কাশফুল সাদা ছাড়াও কিছু হয়। তার ফেসবুকের এমন নামের যুক্তি-‘মানুষ কাশফুলকে ছুয়ে দেখে, ছবি তুলতে এই ফুলের সাহায্য নেয়, কিন্তু ভুল করেও এই ফুলকে বাড়ির সৌখিনতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগায় না।’
ফেসবুকে আসলাম।
‘কেমন আছেন?’ প্রথম আমিই লিখলাম।
‘হ্যা ভালো। আপনার বাড়ির সবাই ভালো?’
‘হ্যা।’
‘আপনার মা কিন্তু অনেক ভালো আর ইশিকা তো সেই ভালো। বাবা একটু কঠিন কিন্তু সুন্দর মনের মানুষ।’
অবাক হলাম। কি লিখবো তাই বুঝছি না। আমি আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তার সাথে কখনোই এতো কিছু বলিনি। বোনের নামটাও বলিনি।
‘আপনি কীভাবে জানলেন?’
‘আপনার বাড়ি গিয়ে দেখে এবং জেনে এসেছি।’
রহস্য থাকলেও খুব ভালো লাগছে।
‘কীভাবে সম্ভব? আর আমার বাড়ির কেউ তো কিছু বললোও না।’
‘সেটা তো জানি না। ফোন দিচ্ছি রিসিভ করেন।’
অফলাইন হওয়ার আগেই ফোন বেঁজে উঠলো।
‘হ্যা বলুন’ ল্যাপটপটা শাটডাউন দিতে দিতে ফোন রিসিভ করলাম।
‘আপনি কোথায় জব করেন, আপনার ফোন নম্বর আমার কাছে, এগুলো থাকলে কারো বাড়ি খুঁজে বের করা কী অসম্ভব?’ কিছুটা হাসিমাখা কন্ঠ ঈশীর।
‘তা ঠিক, কিন্তু এত কিছু কেন?’
‘কৃষ্ণচূড়ার গাছ দেখেছেন কখনোও?’ অনেক টা সময় নিরব থাকার পর প্রশ্নটা করলো।
‘হ্যা, অনেক।’
‘এই গাছে ফুল আসার পূর্বে গাছের সব পাতাই ঝরে যায়, তারপর নতুন পাতা গজানোর আগেই ফুল দিয়ে গাছ ভরে যায়। আমরা কখনোও ভাবিই না যে এতসুন্দর ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়ার আগে গাছটি নগ্ন ছিল।’
‘হ্যা। কিন্তু সেটা প্রাকৃতিক নিয়ম।’ বাড়িতে আসার কারণ মেটানোর অধীর আগ্রহ নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছি।
‘সব কিছুই তো প্রাকৃতিক। কোনোটাকে আমরা প্রাকৃতিক বলি আর কোনোটাকে বলিনা। এগুলো আমাদের ভাবনার ভুল। এগুলো ছাড়ুন। আপনার পরিবারটা কিন্তু অসম্ভব সুন্দর।’
‘আমার………’ কথা শেষ না হতেই কেটে দিলো। ফোন দিলাম, বন্ধ।
অনেক-অনেকবার ফোন দিলাম, বন্ধ।
নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছে। কী করা উচিৎ তা ভেবে পাচ্ছি না। ল্যাপটপ টা ওপেন করলাম। না, ফেসবুকেও নেই। আবার ল্যাপটপ বন্ধ করলাম।
দুপুরে খাবার টেবিলে ইশিকার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হলাম। হ্যা, ঐশী এসেছিলো। বাড়ির কেউ তাকে চিনেনা। আমার বন্ধু পরিচয় দিয়ে গতকাল এসেছিলো। সবার সাথে অনেক সময় কাটিয়ে গেছে। ইশিকাসহ আমার রুমেও সময় কাটিয়েছে।
‘হ্যারে নিশাত, তোর বন্ধুর বিয়ে হইছে?’ খাবার টেবিল থেকে উঠবো এমন মায়ের জিজ্ঞাসা।
ইশিকা আমার দিকে হেসে হেসে উত্তর কামনা করছে সেটা দেখে আর উত্তরই দিলাম না।
কেটে গেছে ছুটির দুই দিন, ভর্তি শেষ ইশিকার। ব্যস্ততা সেই আগের মতোই। প্রতিদিন বা প্রতিরাত যেকোনো সময়ই ঈশী আমাকে নয়তো আমি ঐশীকে ফোন বা ম্যাসেজ দিয়েই চলেছি। নিজেদের জড়তা কাটাতে পেরেছি। নিজেদের ভালোলাগা একই রকম করে নিতে চেষ্টা করেছি দু’জনই। পছন্দের সবকিছুই প্রায় একটাই করতে পেরেছি। এখন দু’জনের যোগাযোগ না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। আমার বিষয়ে ঐশী প্রায় সবকিছুই জেনেছে আমার অজান্তেই আরো দুইদিন আমাদের বাসায় এসে। আমি ওর বিষয়ে যা জেনেছি তা শুধুই ওর নিজের বর্ণিত আর আমার বিশ্বাস।
ঐশী আর বড়ভাই মিলে সংসার। বড়ভাই পেশায় শিক্ষক। বাবা মারা না গেলে বড়ভাইয়ের বিয়েটা এর মাঝেই হয়ে যেত। বাবা সারাজীবনই প্রায় নেশাগ্রস্থ ছিল। ওর মা মারা যাওয়ার পর বড়ভাই ঐশীকে মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি। মায়ের মৃত্যুকষ্ট আর বাবার অমূল্যায়ন দেখে বড়ভাই বাবাকে ভালোচোখে দেখতো না। এমনকি ওর মায়ের মৃত্যুর আগের মূহুর্তের ঔষধের টাকা দিয়েও নেশা করেছেন। এরপর থেকেই আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে ওরা দুজন থাকতো।
পড়াশুনার দিক থেকে কেবল স্নাতক (সম্মান) শেষ। ফলিত রসায়ন।
নিজের প্রতিটা ভালোলাগার সাথে তাকে মিলিয়ে নিতে এখন আর কষ্ট হয় না। ওর মতো হয়ে উঠেছি না হয় ওই আমার মতো হয়ে উঠেছে। যেকোনো বিষয়েই খোলামেলা বলা যায় বা বলে।
‘আমি আপনাকে আমার জীবনে জড়াতে চাই। জড়াবেন?’ কিছুটা সাহস করেই ফোনে বললাম একদিন। কোনো উত্তর নাই। কিছুক্ষণ পর ফোন বন্ধ করে রাখলো।
প্রায় সতেরো দিন থেকে কোন যোগাযোগ হচ্ছে না। নিজেকে কোনোভাবেই ঠিক রাখতে পারছি না। ম্যাসেজের পর ম্যাসেজ, ফোনের পর ফোন, ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে ম্যাসেজ………………
ফোন বন্ধ। ফেসবুক অফলাইন। হাজার সমস্যা হলেও তার বাড়ির ঠিকানায় যেতে নিষেধ আছে তার। তাই সেটাও পারছি না।
শীতের সন্ধ্যা। হাজার চেষ্টা করেও পারলাম না একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে। প্রায় এগারোটা বেজে গেছে। মেডিক্যাল থেকে বেড়িয়ে ড্রাইভারকে ফোন দিতে গিয়ে ম্যাসেজ পেলাম-‘কথা বলবো।’
ফোন দিলাম। ফোনটা ধরেই-‘কাল দেখা করবো, সময় হবে আপনার?’
ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তবুও বললাম-‘হ্যা’
এরপর শুধু দেখা করার জায়গাটা বলে দিলো।
‘আর কিছু বলবেন?’ খুব দ্রুতগতিতে বললো ঐশী।
‘হ্যা বলবো।’ হাজার চেষ্টা করেও কথা আসছিলো না।
‘বলেন, চুপ করে আছেন কেন?’
‘আমি শুধু উত্তর জানার জন্যই যাবো, আপনাকে দেখার জন্য নয়।’
অনেকটা সময় নিয়ে বললো-‘আপনার কী বিশ্বাস আমি আপনাকে উত্তর দেওয়ার জন্যই যাবো?’
‘হ্যা।’ নিজের বিশ্বাস থেকেই উত্তর টা দিলাম।
‘যেখানে বেশি বিশ্বাস থাকে সেখানেই বেশি হতাশ হতে হয়, সেটা জানেন তো?’ হাসিমাখা কন্ঠেই বললো ঐশী।
‘এতোদিনে যা যা বলছো তোমার নিজের বিষয়ে সেগুলো মেনে নিয়েই আমি তোমার কাছে উত্তর জানতে যাব। আর বিশ্বাস তুমিও আসবে।’
হাসিটা বুঝতে পারলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর বললো-‘দেখা যাক। আর আমি তো আপনাকে চিনতে পারবো কারণ আপনাকে দেখেছি আপনার বাড়ির ছবিতে। কিন্তু আপনি কিভাবে চিনবেন আমাকে?’
‘পোশাকের বিবরণ আর সময়টা বলো।’ জানতে চাইলাম ঐশীর কাছে।
‘কৃষ্ণচূড়ার রং-এ রাঙানো সব পোশাক, আর অফহোয়াইট চাঁদর। ঠিক ঠিক বিকেল ৪ টা। বাকিটা খুঁজে নিবেন।’
সাথে সাথেই ফোন কেটে দিলো। শুধু কেটে দিয়েই শেষ নয়, বন্ধ। ঐশীর এটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে মনেহয়।
এদিকটা আসা হয় না খুব একটা। যদিও অনেক নিড়িবিলি তবুও। সেনানিবাসের মাঝের পরিপাটি রাস্তা দিয়ে হেটে চলেছি বিলের দিকে। ঠিক ৪টায় ঐশী দেখা করবে।
সেনানিবাসের শেষপ্রান্তে বিলের পাড়ে গাছেঢাকা একটা জায়গা। জারুল গাছের পাতায় ছেয়ে গেছে এলাকা। তেমন কেউই নাই। অনেকটা দূরে দাড়িয়ে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে গল্প করছে।
হাতে ঘড়ি না থাকলে বোঝার উপায় নাই প্রায় ৪ টা বাজে। সন্ধ্যার কুয়াশাটা এখনোই অনুমান করা যাচ্ছে। বিলের পাড়েই বসে আছি। নিজের ভেতরের অস্থিরতা জীবনের প্রথম অনুভব করছি। বিলের হালকা স্রোত চোখে পড়ছে না জমে থাকা কচুরীপানার জন্য। নিজের ভেতরের অদৃশ্য স্রোতের সাথে মিল খুজে পেয়ে মনে মনেই হাসছি।
এখন চারটা বেজে প্রায় পাঁচ মিনিট। ফোনটা হাতে নিয়ে ফোন দিলাম। রিসিভ হলো না। আবার ফোন দেওয়ায় কেটে দিলো। আশপাশ তাকালাম, না কেউ নেই। আবার ফোন দিবো এমন মূহুর্তে ম্যাসেজ আসলো।
বুঝলাম, আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। নিজের কতটুকু পরাজয় মাথা নিচু করিয়ে দেয় তা এই প্রথম অনুভব হলো।
ফিরলাম মেডিক্যাল-এ।
ডিসেম্বরের শেষ দিকের শীতকে জয় করার মতো মানসিক শক্তি থাকলেও শারীরিক শক্তিটা এই মূহুর্তে নেই বললেই চলে। সারাদিন সূর্যের মুখটাও দেখিনি। সন্ধ্যায় গুড়িগুড়ি বৃষ্টি যেন শীতটাকে আরোও যন্ত্রণাদায়ক করে তুলেছে। জানি অনেকটা পথ হেটে যেতে হবে। ড্রাইভারকে চলে যেতে বলেছিলাম। রাত যদিও কেবল ৯ টা হবে তবুও রাস্তা একেবারে ফাঁকা বললে ভুল হবে না।
এপ্রোন আর মোবাইলটা ব্যাগের মাঝে নিয়ে হেটে চলেছি। বেশিক্ষণ লাগলো না শরীর ভিজে যেতে। দু’একটা রিকশা এসেও মাঝেমাঝে বলছে-‘স্যার যাবেন?’
উত্তর না পেয়ে আবার চলেও যাচ্ছে। জানি এভাবে ৩৫ মিনিট হাটা পথে বাসায় ফিরতে ফিরতে জ্বর নাহয় হাইপোথারমিয়ায় আক্রান্ত হবই।
‘আপনি আমাকে জয় করতে পারবেন, কিন্তু আমি আপনাকে সুখী করতে পাবো না। এই জন্যই আপনার সামনে যেতে পারলাম না। ক্ষমা করবেন। নিজের বিশ্বাস থেকেই বললাম-যদি কখনোও মনেহয় আমি আপনাকে সুখী করতে পারবো তাহলে নিজে গিয়ে আপনার কাছে নিজেকে সপে দিবো। সেটা আজ হোক বা শতবর্ষী স্বপ্ন হোক।’ ম্যাসেজটা এখনোও চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। নিজের প্রতি নিজের বিশ্বাসের ভঙ্গুরদশা আজ জীবনের প্রথম উপলব্ধি করছি।
‘নিশাত’
হঠাৎ কারো ডাকে নিজেকে ফিরে পেলাম। বাসার পাশের দোকানের মালিক সোহেল ভাই ডাকছে।
‘কোথায় যাচ্ছো এতরাতে? আর বৃষ্টিতে ভিজছো কেন?’
ঠান্ডার তীব্রতা কেবল বুঝতে পারলাম। দু’এক জন আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে লজ্জাও পেলাম। নিজের বাসা পেড়িয়ে কিছুটা চলে গেছিলাম। উত্তর না দিয়ে একটু হাসি এঁকে ফিরলাম বাসার দিকে।
বাড়ি ফিরলাম রাত যখন পৌনে দশটা বাজে। বাড়ির সব আলো নিভানো। ঘরের দরজায় দাড়িয়ে শব্দ করবো এমন সময় দেখলাম দরজা খোলাই আছে। অবাক হলাম। তাড়াহুড়ো করে ভিতরে ঢুকলাম। সুইচ বোর্ডের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতেই ঘরের বাতি জ্বলে উঠলো। বাবা-মা, ইশিকা বসে আছে বিছানায়। সাথে একজন।
‘সেই বিকাল থেকে ঐশী আপু এসে বসে আছে তোমার অপেক্ষায়, আর তুমি?’ ইশিকা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলায় তাকালাম ঐশীর দিকে। হ্যা, এই পোশাকেই আসার কথা ছিল বিলের পাড়ে বিকাল ৪টায়। আমার এমন গুটিয়ে যাওয়া অবস্থা দেখে হাসলো সবাই। বুঝে উঠার আগেই ঘরে শুধু ঐশী আর আমি।
এগিয়ে আসলো ঐশী। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের কি যেন মুছে দিলো। হাতটা ধরে বসিয়ে দিলো।
‘বলেছিলাম বিলের পাড়ে যাবো না, কিন্তু একবারও বলিনি কোথাও যাবো না। আমাকে বুঝতেও পারলে না?’
আমার উত্তরের আশায় থাকলো না ঐশী। গত কয়েক মাসে আমার দেয়া প্রতিটি ম্যাসেজের, আকাঙ্ক্ষার প্রতিদান দিলো ও, সাথে এক বিকেলে দেখা না হওয়ার প্রায়শ্চিত্র। আমার ভেজা কাপড়ের স্পর্শে বর্ণিল কাশফুলের মৃত্যু ঘটিয়ে সে যে এক ভালোবাসাময়ী নারীতে পরিণত হতে চাইছে সেটা বোঝার ক্ষমতা আছে দেখেই তাকে ভালোবাসার অধিকারটা আমার আছে।

Comments