January 21, 2018 6:57 am

গুম আতঙ্ক সিলেটে

গুম। সিলেটের রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মাঝে নতুন এক আতঙ্ক। নারায়ণগঞ্জে অপহরণ করে ৭ জনকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে যখন উদ্বেগ, তখনই সিলেট থেকে এক রাজনীতিবিদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সিলেটে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্ককে আরও গাঢ় করেছে পেছনের ইতিহাস। গুমকাণ্ডে সিলেটের অতীত ইতিহাস চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নেয়ার মতোই। তাই গুমের ভয়ে অনেকেরই ঘুমহীন রাত কাটছে। বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে ঘরের বাইরেও বেরোতে চান না তারা। অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা ফোন কলও রিসিভ করেন না। বাড়ছে একের প্রতি অপরের অবিশ্বাসও। আবার একে সুযোগ হিসেবেও নিচ্ছেন অনেকে। ফায়দা নিতে নিজেই সাজাচ্ছেন অপহরণ নাটক।
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে বেশ কিছু নিখোঁজের ঘটনা ঘটলেও কূল-কিনারা হয়নি বেশির ভাগেরই। একের পর এক নিখোঁজ ঘটনায় যারা হারিয়ে যাচ্ছেন তারা যেন হারিয়েই যাচ্ছেন। খোঁজ আর মিলে না। শেষ হয় না স্বজনদের অন্তহীন অপেক্ষার। সর্বশেষ গত ৪ঠা মে সুনামগঞ্জ থেকে সিলেটস্থ বাসায় আসার পথে নিখোঁজ হন যুক্তরাজ্য বিএনপির উপদেষ্টা মুজিবুর রহমান মুজিব। তার সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন গাড়িচালক রেজাউল হক সোহেল। সিলেট-সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েও পুলিশ এখনও তাদের সন্ধান পায়নি। একই ভাবে ২০১২ সালের ১৭ই এপ্রিল বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সে সময়কার সভাপতি এম ইলিয়াস আলী তার গাড়িচালক আনসার আলীসহ ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন। একই মাসের ৩ তারিখে ঢাকার উত্তরার ৬ নং সেক্টরের একটি বাসা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনার ও ছাত্রদল কর্মী জুনেদ আহমদ। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ফিরে আসেননি এ চারজনের কেউই।

২০০৭ সালের ২৮শে জুলাই সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজার থেকে নিখোঁজ হন এক মসজিদের ইমাম। স্থানীয় নোয়াগাঁও মসজিদের ইমাম ক্বারী আবদুল গনির খোঁজ মেলেনি ৭ বছরেও। এ ঘটনায় ওই বছরের ১২ই আগস্ট আবদুল গনির স্ত্রী নেহারুন্নেছা কোতোয়ালি থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন।
২০০৬ সালের ১৩ই নভেম্বর নগরীর মিরের ময়দানস্থ পুলিশ লাইন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হয় চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র মাশিয়াত। ৮ বছরেও সন্ধান মেলেনি মাশিয়াতের। মা আমেনা বেগম এখনও ছেলের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই ঘটনায়ও থানায় মামলা দায়ের হয়েছিল।
১০ বছর হয়ে গেলেও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানের সন্ধান এখনও পাননি তার স্বজনরা। ২০০৪ সালের ১৭ই অক্টোবর, তখন ছিল রমজান মাস। উপ-শহরের বাসিন্দা নগরীর কালিঘাটের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান ইফতার শেষে বাসার বাইরে বের হন। ফিরে আসেননি আর। হাবিবুর রহমান কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কোন শত্রুও নেই তার। তবে কেন গুম হবেন তিনি- এ প্রশ্ন তার পরিবারের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা পুলিশের কাছ থেকে ডিবি’র হাত ঘুরে সিআইডিতে গেছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

সিলেটের আলোচিত এক নিখোঁজ ঘটনা হচ্ছে ডা. রোকন উদ্দিনের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা। ২০০৩ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি একটি প্লট কেনার জন্য সিলেটের বাসা বিক্রি করে ৩০ লাখেরও বেশি টাকা নিয়ে ঢাকার পথে রওনা হয়েছিলেন তিনি। দেশজুড়ে তখন সেনা সহযোগিতায় চলছিল অপারেশন ক্লিন হার্ট নামের ‘শুদ্ধি অভিযান’। সে অভিযানেই রোকন উদ্দিন ‘ক্লিন’ হয়ে গিয়েছেন সে সন্দেহ অনেকেরই। যদিও রোকন উদ্দিনের নামের সঙ্গেও ছিল সামরিক পদবি ‘মেজর’। জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট রোকন উদ্দিনের ব্যক্তিগত পরিচিতি থাকায় বিষয়টি নিয়ে সে সময় বেশ আলোচনা হয়েছিল। নিখোঁজের চার দিন পর ২৪শে ফেব্রুয়ারি তার ভাগ্নে মবিন আহমদ জায়গীরদার কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এর প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু হয়। তবে অবসরপ্রাপ্ত এ সেনা কর্মকর্তার নিখোঁজ রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি রাষ্ট্রের কোন গোয়েন্দা সংস্থাই। অভিযোগ আছে, সরকারের উপর মহল থেকে তখন উল্টো তদন্ত কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছিল। এরপর সরকারের পালাবদল হলেও ডা. রোকন উদ্দিন নিখোঁজ রহস্য রহস্যই থেকে গেছে। ১১ বছরেও জানা যায়নি রোকন উদ্দিন আদৌ বেঁচে আছেন কিনা।

সব কিছুর মাঝেই ফায়দা খোঁজেন যারা বসে নেই তারাও। অপহরণের ভিড়ে একে অনেকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছেন। পাওনাদারদের থেকে বাঁচতে এমনই এক নাটক সাজান দক্ষিণ সুরমার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শমসের আলী। আত্মগোপনে থেকে প্রচার করেন তাকে অপহরণ করা হয়েছে। সে মতো তার বড় ভাই থানায় জিডি করেন তবে সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যায় পুলিশ যখন তাকে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে উদ্ধার করে। ২০১২ সালের মে মাসের শেষ দিকেও এমন একটি নাটক মঞ্চায়িত হয়েছিল সিলেটে। সে সময় স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, ২৫শে মে থেকে শামীম আহমদ নামে নগরীর আম্বরখানার এক ব্যবসায়ী নিখোঁজ রয়েছেন। বিজ্ঞাপনের তথ্যমতে, ব্যবসার কাজে তিনি ঢাকা গিয়েছিলেন। তারপর থেকেই নিখোঁজ। এ ঘটনায় সে সময় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা হয়। অবশ্য কিছুদিন পর শামীম আহমদ ফিরে এসেছিলেন, নিখোঁজ হননি মর্মে জিডি প্রত্যাহার করেন। তবে শামীম আহমদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, ব্যবসার কারণে শামীম আহমদের কাছে সেনা কল্যাণ সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির একটি বড় অংকের টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু শামীম তা পরিশোধ করতে পারছিলেন না। পাওনাদারদের কাছ থেকে বাঁচতেই তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান। তার পরিবারের লোকজন বিষয়টি জানতেন। পাওনাদারদের কাছ থেকে বাঁচতেই এ নিখোঁজ নাটক সাজানো হয়েছিল। পরে সেনা কল্যাণ সংস্থার উদ্যোগে তাকে ফিরিয়ে আনা হয়। পাওনাদারদের সঙ্গে আপস নিষ্পত্তির পর শামীম আহমদ আবার ব্যবসায় নেমেছেন।

বেঁচে আছেন, একদিন ফিরে আসবেন শুধু এ আশাতেই সময় কাটছে নিখোঁজ হওয়াদের পরিবারের সদস্যদের। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলেই তারা দৌড়ে ছুটে যান হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জন ফিরে এলেন কিনা দেখতে। তবে দরজা খুললেই মুখোমুখি হন কঠোর বাস্তবতার। ফিরে আসেন না তাদের স্বজনেরা। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এক সময় তারা হাল ছেড়ে দেন, তখন অপেক্ষা অন্তত লাশের খবর যেন মেলে।

Comments

Leave a Reply