January 23, 2018 8:06 pm
তোদের এ জমি আমার চাইঃ আ’লীগ নেতার হুমকি

তোদের এ জমি আমার চাইঃ আ’লীগ নেতার হুমকি

তোদের এ জমি আমার চাই। এ জমি না হলে আমার এতো বড় প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়ে যাবে। ওয়ারী থানার ৪১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজি আবুল হোসেন আবুল এক মুসলিম পরিবারসহ সংখ্যালঘু দুই পরিবারের বাড়ি ও জমি জবরদখল করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে সেখানে তিনি বহুতল ভবন নির্মানের কাজ ধরেছেন। নির্মিতব্য এ ভবনে যাতায়াতের জন্য রবিদাস পাড়ার মুচি সম্প্রদায়ের এই জায়গাটি তার প্রয়োজন। তাই তিনি ওই জায়গায় বসবাসকারী মুচি সম্প্রদায়ের সদস্যদের ডেকে নিয়ে এভাবেই উচ্ছেদ করেন।

 নিজের জীবন ও ছেলে-মেয়েদের কথা চিন্তা করে টাকাটাই নিতে বাধ্য হলাম রবিদাস পাড়ার মুচি সম্প্রদায়ের সদস্যরা বলেন । রবিদাস পাড়া থেকে উচ্ছেদ হওয়া মুচি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাথে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে আবুল হোসেনের নির্মিতব্য বহুতল ভবনে যাতায়াতের রবিদাস পাড়া দিয়ে থাকা দুটি গেটেই খোলা। ভিতরে বেশ কয়েজন শ্রমিক কাজ করছে আর কিছু মাস্তান টাইপের ছেলে গাজা ও মাদকের আড্ডা জমিয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, (গতকাল) এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। সে রিপোর্টের প্রতিক্রিয়াতে আজ গেট খোলা রেখেই গাঁজার আড্ডা জমানো হয়েছে। কারণ, এতোদিন মদ, গাঁজা ও জুয়ার আড্ডা জমানো হতো গেট বন্ধ রেখে। অনেকটা চুপিসারে। আর আজকে খোলা মেলা পরিবেশে। আওয়ামী লীগ নেতা হাজি আবুল হোসেন আবুল তার জবরদখল কর্মকা-ের ধারাবাহিকতায় ওয়ারীর রবিদাস পাড়ার মুচি সম্প্রদায়ের ৭টি সংখ্যালঘু পরিবারের জমি ও বাড়িঘর দখল করে নিয়েছে। আরো ৬টি পরিবারকে বাড়ি ছাড়তে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আবুল হোসেনের জবরদখলকৃত জমিতে বহুতল ভবনের পাইলিংয়ের কাজ চলায় জমিসংলগ্ন মন্দিরটিও হুমকির মুখে পড়েছে। ঘটনার শিকার সংখ্যালঘু পরিবারগুলো বর্তমানে চরম আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন।ওয়ারি থানার ওসি তপন চন্দ সাহা গত রাতে বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোন অভিযোগ নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভবন নির্মাণের গেটের ভেতরে গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনের আড্ডা বসে প্রতিদিন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি বিষয়টি দেখছি। কিছু পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুরান ঢাকার ওয়ারী থানার হেয়ার স্ট্রিটের ওয়েস্টার্ন খালসংলগ্ন সরকারি জমিতে ১৯৪৬ সাল থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত রবিদাস (মুচি) সম্প্রদায়ের ৩০টি পরিবার বসবাস শুরু করে। বর্তমানে সেখানে ৩০০ পরিবারের এক হাজার ৬০০ লোক বসবাস করছে। ছোট ছোট কামরায় গাদাগাদি করে এখানে এক একটি পরিবার বসবাস করেন। কিন্তু এই সম্পত্তির ওপর নজর পড়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা হাজি আবুল হোসেনের। রবিদাস সম্প্রদায়ের বসবাসের এলাকাসংলগ্ন জমিতে তিনি একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। আর এ জমিতে প্রবেশের জন্য তিনি ইতোমধ্যে এখান থেকে ৫টি পরিবারকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে দুটি ঘর ভেঙে তিনি তার জমিতে নির্মিতব্য বহুতল ভবনে যাতায়াতের রাস্তা তৈরি করেছেন। আর একটি দোতলা বাড়ি দখল করে তার ডান হাতখ্যাত (নানা অপকর্মের সহযোগী) স্বপন দাসের মেয়েকে সুইটি ও তার স্বামী মানিককে থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন। রবিদাস পাড়া থেকে যে পাঁচ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদের বর্তমান অবস্থা খুবই করুণ। এরমধ্যে তিনটি পরিবার টিপু সুলতান রোড়ে একটি পরিবার শশী মহল রোডে বসবাস করছে অন্য পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আর আগেই উচ্ছেদ হওয়া দুটি পরিবারের লোকজন রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ঘর ভাড়া নিয়ে অতিকষ্টে বসবাস করছেন।রবিদাস পাড়া থেকে উচ্ছেদ হওয়া মুকলাল রবিদাস এখন টিপু সুলতান রোডের মাত্রিছায়া বিল্ডিংয়ের ৬ষ্ঠ তলায় নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে অতিকষ্টে বসবাস করছেন। বলেন, গত প্রায় ৭০ বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসছি। এখন তিন মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে আমি কোথায় গিয়ে দাঁড়াই? সংকর রবিদাস বলেন, অর্থের অভাবে আমি এখন চোখে অন্ধকার দেখছি। দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো তা জানিনা। তবে আপাতত গাজিপুর শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন থাকার চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানান তিনি। উচ্ছেদ হওয়া অন্যজন দীনেশ রবিদাস। তিনি বলেন, আমার একমাত্র ছেলে প্রাইমারি স্কুলে লেখা পাড়া করে। বউ-ছেলে নিয়ে কোথও গিয়ে দাঁড়াবার স্থান আমারও নাই। তার শ্বশুরবাড়ি ময়মনসিংহের ভালুাকায়। তিনি বলেন, আমিও শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে আপাতত কিছুদিন অবস্থান করার কথা ভাবছি।বিশ্বনাথ রবিদাস বলেন, আমার দুই ছেলে এক মেয়ে। তাদের নিয়ে বর্তমানে অতিকষ্টে টিপু সুলতান রোডের কামালের বিল্ডিংয়ের (কামাল বেকারি) দ্বিতীয় তলায় একটি রুম ভাড়া নিয়ে বসবাস করছি। কোথাও যাওয়ার জায়গা আমার নাই। ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো সে কথা ভাবলে চোখে পথ দেখি না।  রবিদাস পাড়ার একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আবুল হোসেন তার জমিতে প্রবেশ পথের দু’পাশের আরো ১০/১২টি ঘর দখল করার পাঁয়তারা করছে। এ জন্য ওইসব বাড়ির মালিকদের প্রতিনিয়ত বাড়ি ছেড়ে দিতে হুমকি দেয়া হচ্ছে। রাতে আবুল হোসেনের ক্যাডার বাহিনী সেখানে মদ, গাঁজা ও জুয়ার আসর জমাচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গেলে মারপিট এমনকি যুবতি মেয়েদের শ্লীলতাহানিরও হুমকি দিচ্ছে তার ক্যাডারবাহিনী। এ কারণে বর্তমানে রবিদাস পাড়ার সংখ্যালঘুরা চরম আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন।এদিকে, এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, আবুল হোসেন যে জমিতে বহুতল ভবন করছেন সে জায়গাটিও তার দখল করা। সেখানে আগে দুটি হিন্দু ও একটি মুসলিম পরিবার বসবাস করতো। কিন্তু প্রায় ২০ বছর আগে হিন্দু পরিবার দুটি তার অব্যাহত হুমকির কারণে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়। আর মুসলিম পরিবারটি আদালতে মামলা করে। দীর্ঘ আট বছর মামলা চালানোর পর অবশেষে ক্ষমতার দাপটের কাছে পরাস্ত হয়ে আবুল হোসেনের কাছে জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বর্তমানে তাদের ওই বহুতল ভবনে প্লট দেয়ার প্রলোভন দেয়া হচ্ছে। বাড়ির মালিকের ছেলে তুহিনকে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেও রাখা হয়েছে।এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা অভিযোগ করে বলেন, জমিসংলগ্ন মন্দিরটি হুমকির মুখে পড়েছে আবুল হোসেনের জমিতে পাইলিংয়ের কাজ করায়।

Comments

Leave a Reply