January 22, 2018 11:57 pm

দেবে যাচ্ছে রাজধানী

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নানা আশঙ্কা ভর করছে। গবেষকরা বলছেন, পানির আধারে শূন্যতা ক্রমেই ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পানি তুলে ফেলার ফলে আরো ভিতরের দিকে ঢুকে যাচ্ছে মাটির স্তর, নেমে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাও। রাজধানীর ওপরিভাগ হয়ে পড়ছে ভারসাম্যহীন।

মূলত অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ দ্বারা বেহিসাবি পানি উত্তোলনের ফলে ঢাকাসহ সারাদেশেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে সরে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানিও অনিরাপদ হয়ে উঠছে। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে ২ থেকে ৩ মিটার হারে নিচে নেমে গেছে পানির স্তর। দিনে দিনে সম্পূর্ণভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে মানুষ।

দেবে যাচ্ছে রাজধানী

দেবে যাচ্ছে রাজধানী

সুপেয় পানির একমাত্র ভরসা ভূগর্ভ হওয়ায় এই পানি উত্তোলন বন্ধ করা দুঃসাধ্য। বিভিন্ন অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ মাটির ৩০-৩৫ ফুট গভীরেও পানির দেখা নেই। যে কারণে আরও ১০ ফুট গর্ত করে মাটির নিচে বসাতে হচ্ছে সেচ পাম্প। বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ নলকূপ রয়েছে। এই নলকূপ থেকে সেচের জন্য, খাওয়ার জন্য ও শিল্পের জন্য পানি তোলা হয়ে থাকে। দেশে বৃষ্টির পরিমাণ দুই মিটার। তা থেকে ১ মিটার পানি রিচার্জ হয়। এ ছাড়া বর্ষার সময় নদীর কূল ছাপিয়ে পানি যখন ক্ষেত-খামার ও জলাভূমিতে ঢুকে যায়, সেখান থেকে বাকি পানি রিচার্জ হতো। কিন্তু বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নেয়া এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে পানি রিচার্জ হচ্ছে না। ফলে গ্রাউন্ড পানির লেভেল প্রতিবছর নিচে নেমে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. হুমায়ূন আখতার জানান, ভূগর্ভ থেকে যেভাবে খনিজ পদার্থ তোলা হয়,এখন সেই প্রক্রিয়ায় ভূগর্ভ থেকে পানিও তোলা হচ্ছে। ভূগর্ভ থেকে সাধারণভাবে যে পানি তোলা হয়, তা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পূরণ হচ্ছে না। আশপাশের জলাধার ভরাট হওয়াতেই এমনটি ঘটছে। আর বৃষ্টির পানিতেও পুরোপুরি কাজ হচ্ছে না। তিনি বলেন, ভূগর্ভের পানি নিচে নামার ফলে ঢাকা শহরও ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার পলিমাটির নিচে আছে বালুর স্তর। আর সেই স্তরেই আটকে থাকে পানি। এই পানি তুলে ফেললে বালু নিচে নেমে যায়। ফলে যে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, তা পূরণ করতে মাটির আরো গভীরে নেমে যাচ্ছে ঢাকাও। তার ফলে ঢাকার ওপরিভাগে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর একই গভীরতায় নেই।

অন্যদিকে ঢাকাসহ বড় কয়েকটি শহরের আশপাশের নদীতে শিল্পকলকারখানার বর্জ্য পড়ে পানি অতিমাত্রায় দূষিত হচ্ছে। এ পানি যেমন পান করা ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে, তেমনি দূষিত এ পানি মাটির নিচে ঢুকে অগভীর পানির স্তরকেও দূষিত করে তুলছে। ঢাকায় ব্যবহারের উপযোগী পানির মূল উত্স ভূগর্ভস্থ পানি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিবছর ভূগর্ভের পানির স্তর দুই থেকে তিন মিটার করে নিচে নামছে। ভূগর্ভের পানির ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা না হলে আগামী পাঁচ বছর পর আরও আশঙ্কাজনক হারে পানির স্তর নিচে নেমে যাবে। আর্সেনিকের পরিমাণও বাড়বে। তখন নানা ধরনের দুর্ঘটনারও আশঙ্কা করা হয়েছে ওই গবেষণায়।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক গবেষণায় দেখা যায়, ষাটের দশকে ৫০ ফুট নিচ থেকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উঠানো যেত। এখন ১৫০ ফুট নিচ থেকে পানি তুলতে হয়। সাধারণত মাটির নিচ থেকে যে পানি উঠানো হয়, সেটি নদী, খালবিল ও মাটি থেকে যাওয়া পানি। পানি উঠালে প্রাকৃতিকভাবেই আবার পানি চলে আসত। কিন্তু এখন আর ভূগর্ভে সেই পানি যায় না। এর কারণ সেচব্যবস্থা। বোরো মৌসুমে প্রতিবছর যে হারে পানি সেচের জন্য ভূগর্ভ থেকে তোলা হয়, সে পরিমাণ পানি মাটির নিচে যায় না। এ কারণে অগভীর তো দূরের কথা, গভীর নলকূপ দিয়েও অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যায় না।

বিএডিসির ‘গ্রাউন্ড ওয়াটার জোনিং ম্যাপ’ অনুযায়ী, গত বছরের মার্চ-এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ১৫ দিন সারাদেশের ২৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন সম্ভব হয়নি।

বিএডিসির তথ্য মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে ১৭ লাখ শ্যালো টিউবওয়েল মাটির নিচ থেকে পানি উঠায়। এসব টিউবওয়েল ২২ থেকে ২৪ ফুট মাটির নিচ থেকে পানি উঠায়। কিন্তু এখন আর মাটির ২৪ ফুট নিচে গিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কৃষক পাঁচ ফুট মাটি গর্ত করে সেখানে শ্যালো টিউবওয়েল বসাচ্ছে। তারপরও অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) গবেষণায় বলা হয়েছে, মাটির নিচ থেকে অব্যাহতভাবে পানি তোলা হলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ঢাকায় সমুদ্রের লবণ পানি ঢুকে পড়বে। লবণাক্তের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির আধারে শূন্যতা সৃষ্টি হলে রাজধানী ঢাকা ক্রমেই ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভবন হেলে পড়া এবং সুউচ্চ ভবনে ফাটল দেখা দেয়ার একটি কারণ। সংস্থাটি সরকারকে সতর্ক করে বলেছে, এখনই ঢাকাসহ সারাদেশে মাটির নিচ থেকে পানি তোলা বন্ধ করতে হবে।

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ভূগর্ভস্থ উত্স থেকে সেচের ৮০ শতাংশ পানি সংগ্রহ করা হয়। বাকি ২০ শতাংশ আসে মাটির উপর থেকে। ভূগর্ভের পুরো পানিই অপরিকল্পিতভাবে উত্তোলন করা হচ্ছে। ৮০ শতাংশ পানির পরিমাণ হচ্ছে ৫৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার।

প্রতিদিন ঢাকা ওয়াসার ৭৪টি গভীর নলকূপ বিরামহীনভাবে পানি তুলছে মাটির নিচ থেকে। নাগরিক চাহিদা মেটাতে ওয়াসা প্রতিদিন ২১০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করছে । আর এর ৯০ ভাগই ভূগর্ভস্থ পানি আর এই পানির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু পানির তেমন কোনো বিকল্প উত্স নেই। সে জন্য ওয়াসার গভীর নলকূপ প্রায় প্রতিবছরই নতুন করে বসাতে হয়। কারণ এক বছরের বেশি একই গভীরতায় পানি পাওয়া যায় না।

গবেষকদের মতে, দেশের উজানে পদ্মা ও তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীতে ভারতের বাঁধ নির্মাণসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির চাহিদা বেড়েছে। গত চার দশকে দেশে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বেড়েছে প্রায় শতভাগ। খাবার পানি, রান্না, গোসল, সেচ, এমনকি দৈনন্দিন কাজেও ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে মানুষ। এখন সুপেয় ও চাষাবাদের জন্য চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পানিই মেটাতে হচ্ছে ভূগর্ভস্থ থেকে। অপরিকল্পিতভাবে গভীর ও অগভীর নলকূপ দ্বারা এই পানি উত্তোলনের ফলে ঢাকাসহ সারাদেশেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসা এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) তথ্য মতে, বর্তমানে ঢাকার পানির চাহিদা প্রধানত মেটানো হচ্ছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তর থেকে উত্তোলন করে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে একসময় নদী-নালা, পুকুর বা জলাধারের পানি কৃষি আবাদ ও সুপেয় পানি হিসেবে ব্যবহূত হলেও এখন ভূগর্ভস্থ পানিই একমাত্র ভরসা। সত্তরের দশকের আগে দেশের মানুষের কাছে সুপেয় পানির প্রধান উত্স ছিল ভূপৃষ্ঠ বা পুকুর, নদী-খাল, বৃষ্টি আর জমিয়ে রাখা পানি। সত্তরের দশকের শুরুতে কৃষিকাজের জন্য দেশে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু হয়। আশির দশকে তা ব্যাপকতা পায়। সেই যে শুরু এরপর আর থামানো যায়নি।

Comments