January 22, 2018 12:19 pm

না কাঁদলে বুকটা পাথর হয়ে যাবে

ছাদের এক কোনায়
দাড়িয়ে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। কিছু বলতেও পারছিনা কিছু সইতেও পারছিনা। নাহ থাক আজ আর বাধা দেবোনা। অন্তত আজকের দিনটা কাঁদুক। না কাঁদলে বুকটা পাথর হয়ে যাবে। কেঁদে কেঁদে মনটা হালকা করুক। লাবণ্য! আমার মেয়ে। গত পনেরো টা বছর বুকের ভিতর আগলে রেখেছি। শুধু ওর জন্মদিন ছাড়া আর কখনোই বুঝতে দেই নি যে তার মা তার সাথে নেই। আমিই ওর মা! আমিই ওর বাবা! আমার মেয়েটাও তা বুঝে। তাই তো আমাকে আড়াল করে ছাদের এক কোনে এসে লুকিয়ে লুকিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে। নিজের জন্মদিনে জন্মদায়িনীর কথা কার না মনে পড়ে? ছোট বেলায় মাকে হাড়িয়েছে।

না কাঁদলে বুকটা পাথর হয়ে যাবে

না কাঁদলে বুকটা পাথর হয়ে যাবে

মা কি জিনিস সেটাই বুঝতে পারে নি মেয়েটা আমার। তার সব বন্ধুদের মা আছে শুধু তার নেই। সারা দিন বন্ধুদের কাছে মায়ের গল্প শুনে দিন শেষে আমাকে এসে বলে বাবা ওরা এমন কেনো করে বলতো? ওরা জানেনা আমার বাবাই আমার মা? আমার বাবার মতো বাবা আর কয়টা হতে পারে? চাইনা আমার মা! আমার বাবাই আমার পুরো পৃথীবি! মেয়েটা এই কথা বলে যখন আমার বুকে মাথা রাখে তখন মনে হয় পুরো পৃথীবির যতো সুখ আমার বুকে এসে ঠেকেছে। পাগলি মেয়েটা বাবা ছাড়া কিচ্ছু বুঝেনা। মাঝে মাঝে বলি। মা ধর তোকে বিয়ে দিয়ে দিলাম। তখন আমায় ছাড়া কি করে থাকবি? উত্তরে বলে আমি তাহলে বিয়েই করবোন আমি হাসি আর হাসি। আমি বলি তা কি করে হয় মা? আমার যে কতো স্বপ্ন তোকে রাজকণ্যার মতো সাজিয়ে কোনো এক রাজকুমারের হাতে তুলে দেবো। মেয়ে আমার বলে! আমি চলে গেলে তোমার কি হবে বাবা? নাহ আমি তোমায় ছাড়া কোথাও যাবোনা । পাগলী মেয়ে আমার! মাদার্স ডে তে সব বন্ধুই তার মাকে উইস করে। কিন্তু লাবণ্য পারেনা।

দিন শেষে বাসায় যখন ফিরি চমকে দেয় আমাকেই! কারণ আমিই যে ওর মা! ওই দিন পুরো ঘড়টা সাজিয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে, আমার জন্য গিফট হাতে নীল শাড়ি পড়ে অপেক্ষায় থাকে কখন যে বাবা আসবে। পাগলী মেয়ে আমার! আমি কিছুই বলতে পারিনা! শুধু চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা জল বের হয়। তা দেখে পাগলী মা আমার আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে আই লাভ ইয়ু বাবা! চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে বাবা আমি আমার সব বন্ধুদের বলে দিয়েছি। আমিও মাদার্স ডে তে আমার মাকে উইস করি। কিন্তু তারা বুঝেনা তুমিই যে আমার মা তুমিই যে আমার বাবা। কিছুই বলতে পারিনা আমি। শুধু বুকে জরিয়ে ধরে কয়েক ফোটা জল ফেলি। অর্পীতা! লাবণ্যের মা!

অর্পীতার সাথে বিয়ে হবার পর আমাদের জীবণ খুব ভালোই কাটছিলো। না চাইতেই অর্পীতা আমাকে একটা খুব মূল্যবান উপহার দিয়েছে। হুম তা আর কিছুই না আমার পাগলী মা লাবণ্য কে! খুব খুশি হয়ে অনেক লাফালাফি করেছি। আর অর্পীতা তা দেখে শুধুই হাঁসে আর হাঁসে । তার ঠিক দু বছরের মাথায় অর্পীতা নামের নিষ্টুর মেয়েটা একা করে দিয়ে চলে গেলো আমাকে আর লাবণ্যকে। দিনটা ছিলো বৃষ্টির দিন। ছাদে কাপড় শুকাতে দিতে গিয়েই স্লিপ কেটে ছাদ থেকে পড়ে যায় অর্পীতা । পাড়া প্রতীবেশি হাসপাতালে নিয়ে যায় অর্পীতাকে । অফিসে ফোন পেয়ে ছুটে আসি বাসায় লাবণ্য কে বুকে জরিয়ে কেঁদে কেঁদে হাঁসপাতালে ছুটে গিয়ে দেখি অর্পীতা চলে গেছে অনেক দূরে। অনেক দূরে…..
যেখান থেকে কেউ আর ফিরে না। অর্পীতাও আর ফিরে আসেনি।

সেই থেকেই লাবণ্যই আমার বেঁচে থাকার এক মাত্র অবলম্বন। মেয়েটা আমার এখনো সেই কোনাটায় দাড়িয়ে কাঁদছে যেই খানে ওর মায়ের শেষ যাত্রা পথ ছিলো। ছাদে একেবারেই আসে না এক মাত্র এই দিনটা ছাড়া। তাই আজ আর বাধা দেবো না পাগলীকে। কাঁদ আরো কাঁদ। কেঁদেই যা মা! কাঁদার মধ্যেও এক প্রকার শান্তি আছে যেটা কাউকে বোঝানো যায়না। আমি যে আর কাঁদতে পারিনা, কি করে কাঁদবো সব চোখের জল যে শুকিয়ে গেছে আমার শুধু তোর জন্য। হ্যাঁ শুধু তোর জন্য আমি আর কাঁদতে পারিনা।

Comments