January 23, 2018 11:38 pm

মাতৃত্বের বন্ধন

তুই এটা কি করলি আসিফ? তুই এতটা নিষ্ঠুর হতে পারলি? মায়ের ভালবাসার প্রতিদান এভাবে দিলি? আজ আসিফের নিজের বুকের ভিতরের আত্নাটা শত ক্রোধ আর ধিক্কার দিয়ে প্রতিনিয়ত আর্তনাদ করে উঠছে।নিজের প্রতি ঘৃণা আর অনুশোচনা নিয়ে চিৎকার করে উঠে আসিফ =
না, না, আমি করতে চাই নাই ।সব নিলয়ার ইচ্ছায় হয়েছে। আমি করতে চাই নাই,মা গো =। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আসিফ।
আজ আসিফ একা, সত্যি একা। বেশ কয়েক দিন ধরে ভীষণ জ্বর আর চিকেন ফক্সের অসহ্য যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। যার কারনে সহকর্মীদের ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে ছোট্ট একটা হোটেল কক্ষে।প্রবাসের একাকীত্ব ঘ্রাস করে নিতে চাইছে সকল শক্তি।

মাতৃত্বের বন্ধন

মাতৃত্বের বন্ধন

=মা=-ও মা =–মা গো
= এখন মাকে ডেকে কি হবে? মায়ের কাছে তো তোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।তুই বড় হয়ে গেছস। অনেক বড়।বিদেশে থাকছ।লাখ টাকা বেতন। বৃদ্ধা, অকর্মণ্য, অপদার্থ মাকে দিয়ে আর কি হবে? আসিফের আত্না আসিফকে ধিক্কার দেয়।
= ওই, আমার মা সম্পর্কে একটাও বাজে কথা বলবি না।
= কেনো? এগুলো কি তুই বলস নাই?
= না, আমি বলি নাই।( চিৎকার করে কেঁদে উঠে আসিফ)
=এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি? মাত্র এক বছর আগের কথা। ঠিক এমন সময়েই তো।ও, মনে পড়ছে।ওই গুলো নিলয়া বলেছিল, সেই সাথে সুর মিলিয়ে তুই বলেছিলি অপয়া,কুৎনী ====
= আমি বলতে চাইনি।শুধু নিলয়া কে খুশি করার জন্য এগুলো বলেছি।
= নিলয়াকে খুশি করার জন্য আর কি কি করছস? মনে পড়ে কি সেগুলো?
= আমি সব কিছু এনে নিলয়ার হাতে দিতাম।মাকে সে ভাল কিছু খেতে দিত না।
= তোর একবারও মনে হত না? সেই দিন গুলোর কথা। যখন অন্যের বাড়িতে সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে সন্ধ্যায় তোর জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসত।তোকে বুকে জড়িয়ে সুখের পৃথিবীটা খোজার চেষ্টা করত। মাছের কাঁটা গলায় আটকাবে এই ভয়ে কত ধৈর্য নিয়ে তোকে নিজ হাতে খাইয়ে দিত।কখনো চিন্তা করেছিস, মাছ তো এক টুকরা ভেজে ছিল,তাহলে মা ভাত খেয়েছেন কী দিয়ে? সেদিন তো মা অন্যের উপর নির্ভর করে নাই, তুই কেনো নিলয়ার উপর নির্ভর করতি?
জ্বরে মাথা প্রচন্ড রকম গরম হয়ে গেছে।খুব অস্থির লাগছে।আস্তে আস্তে বাথরুমে গেল মাথায় পানি দিতে।পানি চালু করে টেপের নিচে মাথা দিয়ে বসল আসিফ।মনের অজান্তেই বলতে লাগল,
= মা, ও মা, মা গো, ,,,,,,, তুমি আমায় কত যত্ন করে খাটে শুইয়ে মাথায় পানি দিতে। রাত্রে না ঘুমিয়ে কতবার আমার শরীর মুছে দিতে।আমার শীত লাগবে বলে ফ্যান না চালিয়ে গরম সহ্য করতে।আমি তোমার হতভাগা সেই ছেলে, আমাকে তুমি ক্ষমা কর,,,,,,,,,,,,,
= তোর কোন ক্ষমা নাই। তুই সন্তান নামের কলঙ্ক। মনে আছে? সেই কথা, মায়ের জ্বর হয়েছিল আর তুই কি বলেছিলি ” এটাকে জ্বর বলে? এরকম শরীর গরম তো আমাদের সারা বছরই থাকে। একটা প্যারাসিটামল খেয়ে নিলেই হয়, বুড়ির ঢংয়ে আর বাঁচি না ”
= মা, মা, মা গো =– আমায় ক্ষমা কর।
ঘুম ঘুম ভাব ।আর বসে থাকতে পারছে না। শুয়ে পড়ল আসিফ। পুরনো স্মৃতি গুলো চোখের সামনে এক এক করে ভেসে উঠতে লাগল।
= লোডশেডিংয়ের সময় সারারাত মা কত কষ্ট করে তোকে পাখা করত। আর তুই কেমন ছেলে? বউয়ের ঘরে জেনারেটর থাকলেও মায়ের ঘরের ফ্যানটা ছিল নষ্ট।
= নিলয়া আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল।
= সেই প্রানপ্রীয়া নিলয়া কোথায়? যে তোমার জন্য প্রান বিসর্জন দিয়ে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিল।যে নিলয়ার জন্য মাতৃত্বের বন্ধনকে ছিন্ন করেছিলে।
= নিলয়া আমাকে ভালবাসে না। সে আমার টাকাকে ভালবেসেছে ।সে আমাকে ছেড়ে অন্যের কাছে চলে গেছে।
= আর তুই? যে মা তোকে ভালবাসে তাকে ছেড়ে দিলি? মনে পড়ে? সেই সময়ের কথা। বর্ষায় তোকে কোলে নিয়ে হাঁটু জল পেরিয়ে স্কুলে দিয়ে আসত। তুই কতদিন মাকে জড়িয়ে ধরছ নাই, মায়ের গায়ে নোংড়া কাপড় আর গন্ধ বলে নাক ছিটকিয়েছিস। অথচ মনে কর সেই সময়ের কথা, যখন সারা গায়ে কাদামাটি মাখিয়ে মায়ের কাছে ছুটে আসতি তখন মা স্নেহমাখা ধমক দিয়ে একটুও চিন্তা না করে তোকে কোলে নিয়ে নিতেন। আরে সেই কথাই চিন্তা কর, তুই কতবার মায়ের কোলে পেশাব করেছিস। কতবার মায়ের কাপড় নষ্ট করেছিস পায়খানা করে। কত বছর টয়লেট শেষে তোকে পরিষ্কার করেছে এই হতভাগিনী মা। একবারও তো বলেন নাই, ” ছি ”
= আমার সব মনে পড়ছে। আমি আবার সেই ছোট্ট আসিফ হয়ে যেতে চাই।আমি এখন কি করব? মাকে কল দিব?
= কতদিন মায়ের খোজ নেছ নাই। অথচ নিলয়ার কাছে কল দিয়েছিস ঘন্টায় ঘন্টায়। মাকে কল দিবি কিভাবে? মূর্খ মায়ের মোবাইল লাগে? নিলয়া অনার্সে পড়ে, ওর একটা আইফোন আর ট্যাব তো লাগেই।
= আমি আর পারছিনা। আমি সব ভুলে যেতে চাই। আমি জানি আমার মা আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। বৃদ্ধাশ্রমের তত্ত্বাবধায়ককে কল দিয়ে দেখি।
আসিফ অনুতপ্ত হৃদয়ে তত্ত্বাবধায়কের কাছে কল দিয়ে মায়ের সাথে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করে।

= হে – লো – ও =( কাপা কাপা কন্ঠে)
= মা -আ-আ
= কিরে বাপজান, তুই কানতাছস কেন? তুই কেমন আছস? তোর শরীর বালা তো ? কোন অসুখ লাগাছ নাই তো? ওই খানে খাওন – দাওনে সমস্যা হয় না তো? ওরে, আমার বাপজান।
= মা, মা, মা গো। আমারে মাফ কইরা দেও।আমি তোমার প্রতি অনেক অবিচার করছি। তুমি মাফ না করলে আমার জাহান্নাম ছাড়া আর কোন পথ নাই। মা গো আমারে মাফ কইরা দেও, ,,,,,,,
= কিরে, তুই এডি কি কইতাছস ,তুই এমন কি করছস যে মাফ করন লাগব। বাপরে তোরে দেখতে মনে চায়। কবে আইবি?
= মা, আমি এক সপ্তাহের মধ্যে আইতাছি।তোমারে আর ওইখানে রাখমু না। মা আমারে মাফ কইরা দেও ।
= তুই তাড়াতাড়ি আয়, তোর উপর আমার কোন রাগ নাই।তোর লাইগা তোর পছন্দের হগল খাওন বানামু।বাপ আমার!
আসিফের মাথার উপর থেকে যেন একটা পাহাড় সরে গেল।আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে নিজের অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চেয়ে মায়ের জন্য দোয়া করল- হে আল্লাহ রব্বুল আলামিন, তুমি আমার মায়ের হায়াত বাড়িয়ে দাও, মাকে সুস্থ রাখ, মায়ের পায়ের নিচে আমাকে একটু জায়গা দিয়ো।

Comments