January 23, 2018 11:39 pm

মা, মাতা কিংবা জননীর গল্প

মা, মাতা কিংবা জননীর গল্প

মা, মাতা কিংবা জননীর গল্প

এখন গভীর রাত। নিস্তব্ধ হয়ে আছে প্রকৃতি।

সবাই গভীর ঘুমে অচেতন। হয়তো একটি সুন্দর ভবিষ্যত কিংবা দিন-বদলের সুখ স্বপ্নে বিভোর।

জানালাটা খোলা, বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।

পাশের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির দ্রুতলয়ের স্বরলিপি বেজে চলেছে অবিরাম, ঝম-ঝম-ঝর-ঝর…

মেঘের বুক চিরে মাঝে মাঝে বর্জ্রপাতের কড়-কড় শব্দ। আল্ট্রাসোনিক ওয়েভের প্রচন্ড ধাক্কায় বুকটা দুরুদুরু কেপে ওঠে। ভাষাহীন অন্ধকারে বৃষ্টিপাতের অবিরাম শব্দ যেন বোবা প্রকৃতির বহুদিনের না বলা অব্যক্ত ভাষা হয়ে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ছে। বিস্মৃতির অতলে অন্তরীন স্মৃতিগুলোও আজ চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠছে-স্লো মোশন ছায়াছবির মত। সে স্মৃতিগুলো কত মধুর, কত হাঁসি-কান্না আর আনন্দের! হাজারো স্মৃতির ভীড়ে কিছু স্মৃতি এসে বারবার দোলা দিয়ে যায় মনের পর্দায়…

সে বার যখন চিকেন পক্স আর টাইফয়েডে পড়ে টানা এক মাস বিছানায় পড়ে ছিলাম, আমার পেশাজীবী মা চাকরী বাদ দিয়ে সারাক্ষণ একমাত্র ছেলেটার শুশ্রূষায় ব্যস্ত ছিলো। হেলা-দোলা মা আমার দিনের পর দিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গিয়েছিলো। মোটা শরীরের একজন মানুষ কিভাবে এক মাসের মধ্যেই শুকিয়ে স্লিম হতে পারে না দেখলে সেটা বিশ্বাস করতাম না। আজ কি আমার মায়ের না ঘুমানো সেই রাতগুলোর কথা বলব?

বাবার যখন ডায়াবেটিস ধরা পড়লো, সাথে বোনাস হিসাবে লিভার ক্যান্সার। সবাই শহর ছেড়ে গ্রামে এলাম। টানা দুই বছর বাবার ব্যয়বহুল ঔষধ আর চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে জমি-জমার সাথে ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট সব গেলো। লোন আর দেনার ঘানি টানতে গিয়ে চাকুরীজীবী দম্পতীর সাজানো-গোছানো স্বচ্ছল সংসার বাবার মৃত্যুর পর নির্মম বাস্তবতায় মুখ থুবড়ে পড়লো। দুই মেয়ে আর ছেলে কে নিয়ে আমার বোকাসোকা মা টার বেচে থাকার যুদ্ধ শুরু হলো। কি যে কষ্টে গেছে সে দিন গুলো! পান্তাভাত আর ঝাল ডলা পেটে ঢেলে স্কুলে যাওয়া, তারপর প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে তরকারীর অভাবে খেজুরের রস আর চাল দিয়ে রান্না করা সাদা ‘জাউ’ গলা দিয়ে নামতে চাইতো না। মা সারা মুখে উচ্ছল আনন্দ ফুটিয়ে বলতো, খেয়ে দেখ দারুন হয়েছে! হাজারো অব্যক্ত কষ্ট বুকের ভেতরে নিয়ে মা আমার এমন কত হাজারো উচ্ছলতা মুখে ফুটিয়ে তুলতো, আজ কি তবে জীবনের রঙ্গমঞ্চে আমার মা এর বুক তোলপাড় করা সেই অভিনয়ের গল্প গুলো বলব?

প্রচন্ড হাড় কাঁপানো শীতে গ্রামের একচালা টিনের ঘরে একটি কাঁথা আর দুইটি কম্বল গায়ে দিয়েও আমি ঠান্ডায় কষ্ট পাই দেখে মা এসে আরো একটি লেপ দিয়ে গেলো। দুইটি কম্বল আর একটি লেপ নিয়ে আমি আরামছে নাক ডেকে ঘুমাই। ক’দিন পর বড় আপু এসে অনেক বকলো আমাকে। এতবড় দামড়া ছেলে তিনটা কম্বল নিয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে, আর ওদিকে মা আমার মাত্র দুটো কাঁথা গায়ে সারারাত কনকনে ঠান্ডায় হিহিহিহি করে কাঁপে। রক্ত জমে যাবার মত এই ঠান্ডায় কি করে মাত্র দুইটা কাঁথা গায়ে ঘুমায়! এমন পাগলামি কেন কর জিজ্ঞাসা করতেই বোকা মা টার সরল উত্তর – “যেদিন তোর ছেলে মেয়ে হবে, সেদিন বুঝবি কেন করি এমন পাগলামি!” শুনবেন নাকি আমার মা এর এমন হাজারো পাগলামির গল্প?

আমি বরাবরই পেটুক স্বভাবের। সামনে প্রিয় খাবার গুলো দেখলে জ্বিহ্বা সামলাতে পারিনা, সেটা ফাস্টফুডের জাঙ্কফুড হোক কিংবা ফুটপাথের সস্তা দোকানের ঝালমুড়ি। বছরখানেক একবার তো ফুড পয়জনিং বাধিয়ে মরতে বসেছিলাম। মা খুব ভাল করেই জানে আমার এই স্বভাব টা। সেদিন মা এর অফিসে কি এক মিটিং ছিলো। সকালে নাস্তার প্যাকেট যখন দিলো, মা সেটা নিয়ে ব্যাগের মধ্যে ভরেছে। তারপর দুপুরে বিরিয়ানির প্যাকেট পেয়ে অফিসের সহকর্মী রা সবাই যখন আয়েশ করে খাচ্ছে, মা টুপ করে সবার অলক্ষ্যে সেটাও ব্যাগের মধ্যে চালান করে দিয়েছে। সারাদিন না খেয়ে মিটিং করে মা যখন বাসায় ফিরতো, ক্লান্তি ভরা চেহারা টার দিকে তাকানো যেত না। কিন্তু নিজে না খেয়ে আমাকে খাওয়াতে পেরে মা’র চোখ দু’টো তে ভাষায় প্রকাশের অতীত অপার্থিব আনন্দ উপচে পড়তো! শুনবেন কি আজ শুন্য পেট নিয়ে সন্তান কে খাইয়ে পরিতৃপ্তির ঢেকুর তোলা এক মা এর কথা?

অভাব তখন সংসারের চারিদিকে জেঁকে বসেছে। বাবার মৃত্যুর পর আর কোনোদিন টিফিন নিয়ে স্কুলে যেতে পারিনি। টিফিন পিরিয়ডে যে যার টিফিন খুলে হৈ-হুল্লোড় করে খেতো, আমি দোতলা স্কুলের বারান্দাতে দাড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে সফেদ মেঘ গুলোর ফাঁকে-ফাঁকে স্বপ্ন বুনতাম। একদিন আমার অনেক কিছু হবে। গাড়ি-বাড়ি সবকিছু করে রাজ্যের সুন্দরী মেয়েটাকে বউ করে ঘরে আনার আগেই টিফিন পিরিয়ড শেষ হবার ঘন্টা বেজে যেতো। প্রতিদিন এভাবে কত যে স্বপ্নের অপমৃত্যু হতো! কোনো কোনো দিন সহ্য করতে না পেরে মা কে জিজ্ঞাসা করতাম, আমাদের এত অভাব কেন মা? আমরা এত গরীব কেন?

মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতেন, কে বলেছে আমরা গরীব? কে বলেছে আমাদের অভাব আছে? চাঁদের মত ফুটফুটে একটা ছেলে আছে আমার, আছে পরীর মত দুইটা মেয়ে। তিন তিনটা আস্ত মানিক বুকে জড়িয়ে থাকার পরও আমার সংসারে অভাব আছে বলে কে! তোর সাথে মায়ের দোয়া আছে, বোনদের ভালবাসা আছে, সারাক্ষণ খুনসুটি করা তিন ভাই বোনের মায়ায় জড়ানো একটা বন্ধন আছে… টাকা-পয়সার হিসাবে গরীব হতে পারি, কিন্তু ভালবাসার নিক্তিতে আমরা অনেক অনেক বড়লোক রে!

মায়ের চোখে ঝলমল করা আনন্দের অশ্রু দেখে এরপর কিছুতে বিশ্বাসই হতে চাইতোনা আমি গরীব ঘরের সন্তান। মনে থাকতো না স্কুলের বেতন বাকি, লজ্জা লাগতো না কোচিং এর টাকা টাও দেওয়া হয়নি ভেবে, আফসোস থাকতো না স্কুল থেকে ফিরে তরকারীর অভাবে আবারও সেই সাদা জাউ খেতে হবে চিন্তা করে…

আমি জানি আরো অনেক মা এর সাথেই আমার মা এর গল্প টা মিলে যাবে। কারন মায়েরা যে এমনি হয়। কিন্ত সব সন্তানের গল্প এক হয়না। কারন আমরা সন্তানেরা মা এর থেকে তিল তিল করে সবটুকু আদর-স্নেহ-ভালবাসা আর সবচেয়ে অমুল্য জিনিস ‘সময়’ টাও আদায় করে নেই। কিন্তু মা এর সবটুকু নিংড়ে নিয়ে বড় হওয়া এই আমরাই মা কে শ্রদ্ধা কিংবা ভালবাসা দূরে থাক, ‘সময়’ টুকু দিতেও কার্পণ্য করি। জনম দুখিনী এই মা গুলো সারাটা জীবন সন্তান কে শুধু দিয়েই যায়। বিনিময়ে অসম্মান আর অশ্রদ্ধা ছাড়া ভালবাসা জোটে খুব সামান্যই।

এখন রমজান মাস চলছে। ইফতারের সময় মাঝেমাঝে আমরা অনেক বেশি খেয়ে ফেলি। সে সময় হাটাচলা তো দূরের কথা, বিছানাতে শুয়ে একটু নড়াচড়া করতেও অনেক কষ্ট হয়।
ভাবুন তো, আপনার শরীরের ওজন পেটে নিয়ে আপনার মা কিভাবে মাসের পর মাস চলাফেরা করতো? শরীরের ভেতর আরেকটা শরীরের ওজন নিয়ে কিভাবে সংসারের কাজ-কর্ম করতো? কোন মাটি দিয়ে আল্লাহ এদের তৈরি করেছেন চিন্তা করেছেন কখনো?

নিজের জন্য সবচেয়ে ভাল পাঞ্জাবী আর জিন্স কিংবা দোকানের সবচেয়ে ভাল সানগ্লাস টার পেছনে হাজার দশেক টাকার বাজেট। আর মায়ের জন্য কয়েক শ টাকা দামের একটা শাড়ি, সাথে একটা ওড়না কিংবা স্যান্ডেল দিয়েই মা এর জন্য কত কিছু করে ফেলেছেন ভাবেন। যে মায়ের পদতলে আমাদের বেহেশত, সে বেহেশত টার কাছে গিয়ে কতবার একটু গিয়ে বসেছেন ভাবুন তো!

সন্তানের কাছে মায়ের চাওয়া খুব বেশি না। অসুস্থ্য হলে সেবা করবে, আর বৃদ্ধ বয়সে টেক কেয়ার করবে – সারাটা জীবন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে এই চাওয়া টুকু কি খুব বেশি?

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার নিজ নিজ মা কে সেবা করার তৌফিক দিন। আমাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিন।

পৃথিবীর প্রতিটা মা ভাল থাকুক। সুস্থ্য থাকুক।

Comments